জেলার খবর

বৈষম্য ও অবহেলার শিকার দর্শনা স্থলবন্দর

দর্শনা

দর্শনা প্রতিনিধিঃ বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয়ের অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও চুয়াডাঙ্গা জেলার ঐতিহ্যবাহী দর্শনা স্থলবন্দরটি অবহেলিত। নানা কারণে ঐতিহ্য হারাতে বসেছে বন্দরটি। এখানে পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দর বাস্তবায়নের সকল সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান। বিগত ২৫ বছরে চার মেয়াদের সরকারের আমলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ৪ জন মন্ত্রী সম্ভাবনা যাচাই শেষে দর্শনা বন্দরকে পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দরে রূপান্তরের ঘোষণা দিলেও আজ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে এ বন্দরটিকে পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দরে রূপান্তরিত করে এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা হোক  সরকারের কাছে এমনটাই দাবি এ অঞ্চলের উন্নয়নবঞ্চিত মানুষের।
জানা গেছে, ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর ১৯৬২ সালে চুয়াডাঙ্গা জেলার দর্শনায় একটি ল্যান্ড কাষ্টমস স্থাপিত হয় যা নানা প্রতিকূলতা ও বিভিন্ন চরাই-উৎরাই অতিক্রম করে এখন পর্যন্ত টিকে আছে। ল্যান্ড কাষ্টমস স্থাপনের পর থেকেই দর্শনায় সুপারিনটেন্ডেন্টের কার্যালয়, রেঞ্জ অফিস, এক্সাইজ অফিস, শুল্ক গুদাম ও কাষ্টমস স্টাফদের জন্য প্রায় ৩৩বিঘা জমির উপরে শতাধিক স্টাফ কোয়ার্টার, গোডাউন, মসজিদ, একটি প্রাইমারি স্কুলসহ কাষ্টমস্রে বিশাল এলাকা রয়েছে। তখন থেকেই রেলপথে দর্শনা সীমান্ত দিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বিভিন্ন প্রকার পণ্য আমদানী-রপ্তানি হয়ে আসছে।
১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দর্শনা সীমান্ত দিয়ে রেলপথের পাশাপাশি সড়কপথেও মালামাল আমদানী-রপ্তানি করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারের ১৯৯১-৯৫ মেয়াদের সড়ক ও রেল যোগাযোগ মন্ত্রী কর্ণেল অলি আহম্মেদ, ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদের সরকারের মন্ত্রী আ স ম আব্দুর রব, ২০০১-০৫ মেয়াদের সরকারের নৌপরিবহনমন্ত্রী কর্নেল আকবর আলী খান ও সর্বশেষ ২০০৮-১৩ মেয়াদের সরকারের নৌপরিবহনমন্ত্রী মোঃ শাজাহান খান দর্শনা বন্দরকে পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দরে রূপান্তরের ঘোষণা দেন। এছাড়া এ সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দর্শনাকে পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দরে রূপান্তরের সম্ভাব্যতা যাচাই করেন। নৌপরিবহনমন্ত্রী কর্নেল আকবর আলী খান এক সময় দর্শনায় রেলওয়ে কন্টেইনার টার্মিনাল করার ঘোষণা দেন। এর কিছুদিন পর টার্মিনালের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট জমি মালিকদেরকে নোটিশও দেওয়া হয়। এই ঘোষনার কিছুকাল পর মন্ত্রীর ইন্তেকালের ফলে বিষয়টি সেময় আর এগোয়নি। বিভিন্ন সময়ে বার বার ঘোষনার পরও অজ্ঞাত কারণে দর্শনা বন্দর পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দরে রূপান্তরিত হয়নি। ফলে এ ব্যাপারে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে এ অঞ্চলের অবহেলিত মানুষ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দর্শনায় পূর্নাঙ্গ স্থলবন্দর বাস্তবায়ন করতে নুতন করে অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য খুব বেশি অর্থ ব্যায়ের প্রয়োজন হবে না। কারন, একটি স্থলবন্দর বাস্তবায়ন করতে যা যা প্রয়োজন তার সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা বিদ্যমান। যেমন, কাস্টমস ইমিগ্রেশন, সুপারিনটেন্ডেন্টের কার্যালয়, রেঞ্জ অফিস, এক্সাইজ অফিস, শুল্ক গুদাম, কাষ্টমস্ স্টাফ কোয়ার্টার, চেকপোষ্ট ভবন, বিজিবি’র আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র, সীমান্তহাটের টোল আদায়ের জন্য একটি ভবন, ৩টি সরকারিসহ ৫টি বানিজ্যিক ব্যাংক, ফায়ার সার্ভিস ষ্টেশন, বিওপি কোম্পানী ক্যাম্পসহ ২টি বিজিবি ক্যাম্প, পুলিশ তদন্তকেন্দ্রসহ শতাধিক কাষ্টমস্ ক্লিয়ারিং এন্ড ফরোয়ার্ডিং এজেন্সী রয়েছে। সেইসাথে রয়েছে ভারি যানবাহন চলাচলের উপযোগি রাস্তাঘাট। ফলে পূর্নাঙ্গ স্থলবন্দরের কার্যক্রম শুরু করতে নতুন করে এসব অবকাঠামো বাস্তবায়ন করতে হবে না। শুধুমাত্র পুরাতন কিছু ভৌত অবকাঠামো মেরামত করলেই চলবে। অভিজ্ঞজনরা জানান, এ সমস্ত অবকাঠামো মেরামতের জন্য এক বছরের আদায়কৃত রাজস্বের টাকাই যথেষ্ট। বছর দশেক আগে দর্শনা পৌরসভার তৎকালীন ও বর্তমান মেয়র মতিয়ার রহমানের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দর্শনা বাসষ্ট্যান্ড থেকে জয়নগর সীমান্ত পর্যন্ত একটি বাইপাস সড়কও নির্মিত হয়েছে। যে সড়কে সিমান্ত থেকে আমদানীকৃত মালামাল ট্রাকযোগে দর্শনা বাসষ্ট্যান্ড হয়ে দর্শনা-চুয়াডাঙ্গা রুটে মেহেরপুর, কুষ্টিয়া হয়ে উত্তরবঙ্গ, ঝিনাইদহ হয়ে মাগুরা ফরিদপুর, রাজবাড়ী, বরিশাল, ঢাকা, চিটাগাং, সিলেট যেতে পারবে। অপরদিকে দর্শনা-কালিগঞ্জ রুটে যশোর খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যেতে পারবে। আবার ভারত থেকে ট্রাকযোগে আমদানীকৃত মালামাল রেলপথেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বহন করা যাবে। বর্তমানে ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী ট্রেন চলাচলের কারনে দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলওয়েষ্টেশনে আন্তর্জাতিক মানের কাস্টমস্ চেকপোস্টের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে মৈত্রী ট্রেন চালুর সময় থেকে এখানে অফিসসহ একজন সহকারী কমিশনারও নিযুক্ত আছেন।
সীমান্ত সূত্রে জানা গেছে, ইতিমধ্যেই দর্শনা সীমান্তের বিপরীতে ভারতের গেদে বিএসএফ ক্যাম্প পর্যন্ত চল্লিশ ফুট প্রশস্ত ৪ লেনের সড়ক নির্মিত হয়েছে। আর মাত্র এক কিলোমিটার রাস্তা হলেই সীমান্তের জিরো পয়েন্টে পৌঁছে যাবে। আর দর্শনা সীমান্তে মাত্র কয়েকশ গজ রাস্তা নির্মান করলেই বাংলাদেশ-ভারত দু’দেশের মধ্যে ট্রাক চলাচলের আর কোন সমস্যা থাকবে না।
বর্তমানে দর্শনা সীমান্ত দিয়ে স্থলপথে ও রেলপথে মৈত্রী ট্রেনে প্রতি বছর বাংলাদেশ-ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিপুল সংখ্যক পাসপোর্টধারী যাত্রী যাতায়াত করে থাকেন। অপর দিকে প্রতিবছর রেলপথে দর্শনা দিয়ে ৮ থেকে ১০ লাখ মেট্রিক টন বিভিন্ন প্রকার পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়। ফলে প্রতিবছর সরকার শুধু রেলবন্দর থেকে অর্ধশত কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব আদায় করে থাকে। রেলপথের পাশাপাশি সড়কপথেও পণ্য আমদানি-রপ্তানি করা গেলে চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া জেলাসহ পার্শ্ববর্তী জেলা সমুহের বিপুল সংখ্যক বেকার মানুষের কর্ম সংস্থান হবে। সেইসাথে সরকারি কোষাগারে জমা হবে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। এছাড়া ভবিষ্যতে সীমান্ত সংলগ্ন মাথাভাঙ্গা নদী ড্রেজিং করে এর নাব্যতা ফেরানো গেলে এ নদীপথেও মালামাল আমদানী রপ্তানি সম্ভব। কারন দেশভাগের আগে এই নদীপথেই বড় বড় নৌকায় করে কলকাতা থেকে বিভিন্ন ধরনের মালামাল আনা নেওয়া করা হতো।
এ ব্যাপারে দর্শনা কাস্টমস সুপারিনটেন্ডেন্ট  বলেন, বর্তমানে দর্শনায় পুর্ণাঙ্গ স্থলবন্দর চালুর প্রয়োজনীয় সব ব্যাবস্থা বিদ্যমান। এ বন্দরটি চালু হলে এখান থেকে বাংলাদেশের যেকোন বড় স্থলবন্দরের সম পরিমাণ রাজস্ব আদায় হবে। দর্শনা দিয়ে স্থলপথে পণ্য আমদানী-রপ্তানি শুরু হলে এ এলাকার সর্বক্ষেত্রেই ব্যাপক উন্নয়ন হবে। বর্তমানে এ স্থলবন্দরটি চালুর ব্যাপারে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে নানামুখী কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

Related Post